কবিতা: ডিসেম্বর, ২০২০

ব্রেকাপ

আমি ভয় পাই,
ভয় আমার শার্টের কলার ধইরা রাখে
যেন সে পইড়া যাওয়া থিকা আমারে বাঁচাইতেছে

আমি এই ভয়টারে চিনি,
একটা ভয়েডের মতন সে
আমারে ধইরা রাখে তার ভিতরে

একটা ভয়ের ভিতরে আমি আছি,
ভয়’টা আমারে ধরে ঝুলে থাকতেছে,
বলতেছে, “ভুলে যাইও না, আমারে!”

 

এডভাইস

চোখের সামনে যে কুয়াশা, এইটা তো মিথ্যা
এইটা তো নাই আসলে এতোটা, এর সামনে আছে দৃশ্য আরো…

আমারে বুঝাইতেছে ঘর-পোড়া গরু, বেলতলার ন্যাড়া

দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস

“দেখো, তোমার নিয়তির মতো, তুমিও তো একা…”

বইলা আমার সাথে সারারাত জাইগা থাকলো
দূর আকাশের একটা তারা

 

মিথ্যাবাদী রাখাল

“আমি তো এখন অন্য কারো বাঘ,
অন্য কারো স্বপ্নে থাকি, আপনার ভ্যালিতে
কোনদিন আসবো না আর!”

“আপনার আসা বা না-আসার লগে
ব্যাপারটা তো এতোটা রিলেটেড না,
আপনি বুঝেন নাই,” রাখাল কয় “আপনি তো নাই!
ছিলেন যে কোনদিন – এইটাই তো আমি জানি না,
আমার কাজ হইতেছে সত্যি বইলা কিছু একটা যে আছে,
আর কোনদিন আইসা আমাদের সব মিথ্যাগুলারে দখল কইরা ফেলবে
সেই কথা বলা; যে, দেখো, বাঘ আসতেছে!
আপনি সত্য হয়া উঠবেন কিনা সেইটা তো আপনার চয়েস,
মানে, আপনি যদি কোনদিন না আসেন, আপনি তো বাঘ না আর!”
শুইনা বাঘ হাসে, কয়, “ঠিকাছে, আমি গেলাম তাইলে!
স্বপ্নের ভিতরে কেউ আমারে ‘বাঘ, বাঘ…’ বইলা ডাকতেছে”

রাখাল এই কথা গিয়া লোকজনরে কয়,
“শোনেন বাঘ কিন্তু আছে, আমার লগে কথা হইছে
শে আসবে না বলছে, এখন বিজি আছে, কিন্তু আছে যেহেতু
আবার আসতেও পারে!”

লোকজনও হাসে, আগের মতোই কয়,
“বাঘ তো নাই, কই থিকা আসবে!
তুমি মিয়া মিছা কথা কওয়া ছাড়তে পারবা না কোনদিন…”

 

শীতের কবিতা

তুমি থাকো, বস্তুর ভিতর যেমন লুকায়া থাকে ভাব
দমে দমে জমতে থাকে খালি অবিশ্বাসের পাপ

তুমি থাকো, শীতের একটা মরা নদীর থাইমা থাকার মতো
‘অথচ নদীর পানি কোনদিন থাইমা থাকে না তো!’
এইরকম বাস্তব যুক্তি-বোধের মতো, তুমি থাকো
যা আমি মানি নাই, মানবোও না কোনদিন, কিন্তু
আমার মানা ও না-মানার বাইরে তুমি যে আছো, থাকো!

আমি ধানের নাড়া নিয়া ধানখেতের পাশ দিয়া
ক্যাঁচ ক্যাঁচ করা একটা গরুর গাড়ির মতন,
‘ঘুমের ভিতর বিছানায় বালকের পেশাবের মতন’
লাল রাতা-মুর্গির অহেতুক, ডির্স্টাবিং ডাকের ভিতর
সকালের কুয়াশার ভিতর ধীরে ধীরে চলিয়া যাবো…

তুমি থাকো, যেইরকম বস্তু ও ভাব, এতোটা আলাদা না তো!
এইরকম জীবন-বোধের ভিতর ‘খেজুর গাছে হাড়ি’
বাইন্ধা দিয়া মন, তুমি থাকো, টুপটাপ কুয়াশার মতন
সকাল হইতে না হইতেই কি রকম শব্দগুলা গাছের পাতাগুলাতে জমতেছে, দেখো

 

তক্ষক

বিমানবাহিনী’র কোয়ার্টারগুলার সামনে একটা তক্ষক ডাইকা যাইতেছে। গাড়িগুলার হর্ন তারে পাগল করে দিতেছে। ডাকতে ডাকতে তার গলায় রক্ত উইঠা মইরা যাবে তো সে! তক্ষকটারে দেখতেছি না আমি। কোন গাছের পাতার আড়ালে যে বইসা আছে! আর বুঝতে পারতেছে না এই আওয়াজগুলা যে তার লাইগা না। এইরকম ভুল আমারও হয়।…

আইবিএ’র গ্যারাজে বইসা একটা তক্ষকের ডাক শুনতে শুনতে রিপন ভাই দেখাইতেছিল এই খেলাটা যে, তুমি তক্ষকের ডাকের পরে একটা ডাক দেও, দেখবা ও-ও ডাকবে, থামতে পারবে না। উনি ডাক দিলেন, তক্ষক’টা ডাকলো। কইলেন, তুমি ডাক দিলেও ডাকবে। আমি ডাক দিলাম, তক্ষক তখনো ডাকে। রিপন ভাই ডাকলেও ডাকে, আমি ডাকলেও ডাকে। পরে রিপন ভাই-ই কইলো, আর ডাইকো না। তক্ষকটা তার ডাক থামাইতে পারবো না। হইলোও তাই। আমরা ডাক বন্ধ কইরা দেয়ার অনেকক্ষণ পরেও তক্ষক’টা ডাকতে থাকলো। একটু পরে পরে আবার। আবার কোন আড্ডা থিকা আরো কেউ ডাইকা উঠলো। তক্ষকটা রেসপন্স করলো, ডাইকা উঠলো তখনও।…

তুমি তক্ষক হইও না।

ভোরের আজান

কারা যেন, কারা যেন অন্য কারো
দুনিয়া থিকা আইসা ঢুকে যাইতেছে
আমার দুনিয়ায়

সরায়া ফেলতেছে আমারেই
বলতেছে, যাও, যাও তো!

যেইরকম মোলায়েম একটা শিশিরের কণা
পড়তেছে গাছের নতুন ছোট পাতাটার উপর
আর কাঁইপা উঠতেছে তার পুরাটা অস্তিত্ব

সেই শব্দটা আমাার কানেও বাজতেছে
বোমা ফাটার বিশাল আওয়াজের মতন

অথচ কেউ শুনতেছে না
অন্ধকারের এই একলা একলা চিল্লানি
‘গভীর ক্রন্দন’

ভাবতেছে, কতো সুন্দর নিরবতার ভিতর
আসতেছে একটা ভোর, আজান

আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম…

 

তোমার কথা লিখি

তোমার কথা লিখি
তোমার মতো কইরা লিখি

আমি জানি,
তুমি মনে মনে বলতেছো,
“তুমি যে কি বাল লেখো!”

আমি তোমার কথা লিখি
তোমার মতো কইরা লিখি

কবিতা লেখার চিন্তা আমি
অনেক আগেই তো বাদ দিছি!

 

আমি

নজরে না-দেখা হবো আমি, বস্তুর ভিতরে অন্ধকার
আত্মার ভিতরে কালা অস্পষ্ট একটা দাগ;
আমি ঝুইলা থাকবো কলসি ছিঁড়া দড়িটার মতো, কুয়ার ভিতর

আমি না-বলা একটা নাম, অন্য অনেক নামের সাথে মিইশা থাকবো
ঢেউয়ের পরে আরেকটা ঢেউ, পানির ভিতরে পানি শুধু
‘আকাশের অইপারে আকাশ’

কিন্তু যখন আমি মারা যাবো,
আমি মারা যাবো ঘুমের ভিতরে তোমার
একটা দুঃস্বপ্নের মতো

 

আর্টের কান

ধরেন, ঘটনাটা এইরকম –

ভ্যান গগঁ যে বিরাট আর্টিস্ট
মাইয়াটা এইটা জানতো, আর
শে তাঁর কান কাইটা
দিছিলো
ভ্যান গগঁ’রে

ভ্যান গগঁ
সেইটা না দেইখা
ইন্দুরের খাবার ভাইবা
ছুঁইড়া দিলো তার
আর্টিস্টের বেডের নিচে,
আর্টিস্টের চেয়ারে বইসা

ধরেন, সে কোন ছবি আঁকতেছিল

মাইয়াটা ভ্যান গগঁ’রে কইলো
এইটা তুমি কি করলা?
আমার কান আমি
কই পাবো এখন?

তখন ভ্যান গগঁ
তার কান কাইটা
দিয়া দিলো তারে

শে অইটা নিয়া
ঢিল ছুঁইড়া দিয়া দিলো
এক কুত্তারে

কইলো,
আমি তো আমার কান
কাটি নাই!

কানের দুল নাড়ায়া
দেখাইলো, দেখো
নতুন কানের দুল
আমি পইরা আসছি

কান কাটার যন্ত্রণায়
ভ্যান গগঁ
সেইটাও দেখতে পাইলো না

অজ্ঞান হওয়ার আগে
ডাক্তারের কাছে
যাইতে যাইতে

এক কান দিয়া
শুনলো
রাস্তায়
বাঙালি প্রগতিশীলরা বলতেছে,
বলছিলাম না, এইটা আসলে
কান-কাটা রমজান!

 

সূর্যমুখী খেতের আলো

একটা মন আইসা বসছে একটা মনের কাছে
চীনদেশে, হোয়াংহোর দুঃখ নিয়া কথা কইতেছে,
জানো, আগে কি কি ছিল, কি কি হইতো…

আগের দিনের দুঃখের কথা বলতে বলতে
অরা শরীর নিয়া ঘেঁইষা বসতেছে
দেখো, সূর্য ডুবে যাইতেছে!

সূর্য বেচারা হাসে, কয়, হ
সূর্যমুখী খেতের আলো-ও
সানফ্লাওয়ার সিনেমার সিনের মতোই ছিলো

 

সকাল এগারোটার রইদ

ফ্লোরেন্টাইনের খালি চেয়ারগুলা
কয়েকটা ঠ্যাংয়ের লাইগা বইসা আছে
শীতের বাতাস অদেরকে কাঁপাইতেছে

কিন্তু বইসা থাকা তো অদের কাজ,
অরা বইসা আছে,
বাতাসে বড়ইয়ের ফুল ঝরে পড়তেছে…

চায়ের দোকানে জমতেছে বেকার ক্রাউড
পেট্রোল পাম্পে একটু পরে পরে গাড়ি আসতেছে, যাইতেছে…
কতকিছু শেষ হয়া যাইতেছে, কতোকিছু শেষ হয়া যাইতেছে না

 

যদি তুমি থাকতা

আজানুস্তম্ভিত সভ্যতা
গড়ায়া গড়ায়া পড়তে থাকে ফ্লোরের উপর
এই রইদ, অই রইদ আইসা
ক্ষণিকের ভিক্ষা চাইয়া করুণ
বোবা চোখ নিয়া তাকায়
যেন দৃশ্যগুলা জন্মাইতেছে
তার লাগি
অতি দূর দরিয়ার পাড়ে
পানি দেখতে দেখতে ঘুমায়া পড়ে আবার
জ্ঞানের জাহাজ
চোখ ডলতে ডলতে জাইগা উঠে,
বলে, আমি তোমার!
নিহারির হাড় থিকা ঝোল পড়তেই থাকে
আর কুত্তার লম্বা জিবের মতো
ভাবতে থাকি আমি, তুমি আমার!
ভ্রান্ত বিলাই আইসা চুপে চাপে হাসে,
কি রকম বাইনচোত দেখো!
লেপের তলায় বইসা
শীতকালের রইদরে গাইল্লায়!
কাকগুলা উইড়া যায় সন্ধ্যার কুয়াশায়
আবার সকাল হইলে, আবার কোন
মন-খারাপ আইসা বলে, আসো অতীত তুমি
আজানুস্তম্ভিত মন-খারাপ-লাগায়

 

ক্রোকোডাইল’স টিয়ার্স

সারা নদী সাঁতরায়া, পাড়ের কাদামাটিতে গড়াগড়ি কইরা
কান্তেছিল একটা কান্দার ফোঁটা:

হায় কুমির, তুমি তো আমার হইলা না!

 

বালু নদীর পাড়ে

আমি ফিরতেছি আমার মন-খারাপের কাছে। আমার মন-খারাপ বইসা ছিল এতোদিন বালু নদীর পাড়ে। এখন যেহেতু পূর্বাচল হইতেছে, মন-খারাপ’টা আর অইখানে থাকতে পারতেছে না। বলতেছে, আমারে অন্য কোথাও চলে যাইতে হবে। আরো দূরে। আমি বলি, এইরকম মাঝে মাঝে যে তুমি আসো আমার কাছে, কি মনে কইরা আসো তুমি? মন-খারাপের তো কোন কারণ লাগে না, কয়, এমনেই আসি! তোমার কি ভাল্লাগে না? আসবো না তাইলে? আমি হাসতে হাসতে বলি, একটা মন-খারাপ ছাড়া মানুশ কি থাক্তে পারে! মন-খারাপ’টাও হাসে। (ক-এর লগে ত জোড়া দিছি বইলা মনেহয়।) আর তারপরে তার কিছু একটা মনেহয়; কয়, আ মি চ লে যা বো, আ রো দূ রে. . . বইলা গাঁট হয়া বইসা থাকে একটা পাথরের মতন। পাহাড় হইতে থাকে।

 

কবিতার সকাল

অইদিকে বুদ্ধদেব বসু
তাকায়া আছেন
চোখে নিয়া পানি
(নাকি জল?)

বলতেছেন,
গরুর চোখের মতন
টলমল
কি সুন্দর সকাল!
তোমরা দেখছনি?

দেখার মতন কইরা
তাকায়া থাকতে থাকতে
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ঠাট্টা করলেন
তুমি আবার বরিশাল গেলা কোনদিন?

জীবনানন্দ যেন বুঝেন নাই কিছু
এইভাবে অমিয় চক্রবর্তীরে কইলেন,
চলেন বস, ঘুইরা আসি একদিন!

বিষ্ণু দে আরেকটু সইরা গিয়া লিইখেন
সন্দীপের চর

এইভাবে সকাল দুপুর হইলো

কাজী নজরুল ইসলাম ঘুম থিকা উইঠা
হাই তুইলা কইলেন,
“বাইনচোত’রা, তোরা সর!”

 

উড়তে-পারার ঘটনা

খুদ খায় পাখি
আমি নিজ মনে
বইসা থাকি
উঠানের পাশে

বাতাস আসে
গাছটারে নাড়ায়
পাতাদের ছায়াগুলা
হাসে একটু

পাখিটা থামে,
বাতাসরে দেইখা তার
উড়তে-পারার
কথা মনে হয়

‘আমি তো উড়তে পারি!’
বইলা উইড়া যায় পাখি

 

গান ৩

ঝরে পড়তেছে তোমার
বুঝতে পারা’র ঝোল
কাঁচা হাড়ি ফুটা হয়া
টপা টপ টপ

আর মন-মাঝি
গাইতেছে গান
শুকায়া যাওয়া নদীতে
নিয়া বৈঠা ও বোট

ও মন চোদনা রে…

 

Leave a Reply