“বোকা বোর্হেস”: বাংলা-ভাষায় তাঁর রাজনৈতিক ইন্টারপ্রিটেশন বিষয়ে

বোর্হেস

রাজু আলাউদ্দিন বেশ অ্যাপ্রিসিয়েটবল একটা কাজ করছেন, বোর্হেস নিয়া। তাঁর অনেকগুলি বাংলা অনুবাদ একসাথে কইরা ছাপাইয়া দিছেন।  যদিও বইয়ে বলা আছে, সম্পাদনা; এইটা নিয়া কিছুটা বলছিলাম ফেসবুকের একটা নোটে। (http://www.facebook.com/note.php?note_id=430592530751)

কিন্তু যেই জিনিসটা হাস্যকর, সেইটা হইতাছে যে, উনি বোর্হেসরে প্রায় দেবতার পর্যায়ে নিয়া যাওয়ার একটা কোশিশ অনবরত কইরা যাইতেছেন।  এইটা প্রথম চোখে পড়ে, বোর্হেসের বিষয়ে অন্যান্য লেখকদের লেখার যে একটা সংকলন করছেন, সেইটার ভূমিকাটা পড়তে গিয়া। তারপর এইবার কালের কণ্ঠের ঈদসংখ্যাতে বড় (!) লেখকদের ঝগড়া-বিবাদ (?) নিয়া কিছু ঘটনার বয়ান করছেন; সেইটা করতে গিয়াও তিনি বোর্হেস সর্ম্পকে তাঁর অন্ধভক্তিরে চাপা দিতে পারেন নাই।

কোন একটা বিষয়ে জানা-শোনা লোকজন যখন ভুল ধারণা দিতে শুরু করেন, সেইটার একটা প্রতিবাদ থাকা দরকার। সেই জায়গা থিকাই এই নিয়া লিখতে বসছি। সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই বইটা এখন হাতের কাছে নাই। স্মরণশক্তির উপর ভরসা রাইখাই বলতেছি। ওই বইটাতে যদি কোন পাঠযোগ্য লেখা থাইকা থাকে, সেইটা কার্লোস ফুয়েন্তেস এর। কিভাবে যে উনি বললেন, আমার মুগ্ধতা এখনো কাটে নাই (যদিও প্রায় মাস ২/৩ আগে পড়ছি)।  এইটা ছাড়াও অক্টাভিও পাজ যতোটা সম্ভব বলার চেষ্টা করছেন।  আর বোর্হেসের যে বন্ধু, যিনি ইংরেজী অনুবাদে সাহায্য করছেন; তিনি বন্ধুত্বের একটা অনেস্ট অপিনিয়ন রাখছেন। কইছেন যে, তাঁর বন্ধু পলিটিক্যালি রাইট ডিসিশন খুব কমই নিতে পারছেন; এক স্বৈরশাসকের সাথে ডিনার করতে যাওয়ার কারণে যে, তাঁর নোবেল ছুইটা যাইতে পারে; সেইটার ধারণাটা সম্ভবত উনার ছিলো না।

একজন লেখকের পক্ষে পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকাটা সবসময় সম্ভব না; সবাই তো আর নেরুদা না!

কিন্তু ভূমিকাটাতে রাজু আলাউদ্দিন বোর্হেসের বিপক্ষে সব কিছুই অস্বীকার কইরা তাঁর একটা দেবতার মতো ভাবর্মর্তি ফুটাইয়া তোলার চেষ্টা করছেন।  আরো মানবেন্দ্র এর সাথে ঝামেলা বাঁধাইছেন বোর্হেসের যথেষ্ঠ মূল্যায়ন করেন নাই বইলা এবং তাঁর সর্ম্পকে উল্টা-পাল্টা তথ্য দিছেন বইলা। এই উল্টা-পাল্টা তথ্য দেয়াটা অবশ্যই বাজে একটা কাজ। তাই বইলা অন্ধভক্তি নিয়া ইন্টারপ্রিটেশন করাটা জায়েজ হয়া যায় না।

যেহেতু কালের কণ্ঠ টা হাতের কাছে আছে, সেইটা থিকা কিছু উদ্ধৃতি দিতে পারি।

প্রথমেই চোখ আটকাইলো, আস্তুরিয়াস বনাম বোর্হেস (এই ‘বনাম’ শব্দটা বেশ মজার, রেসলিং রেসলিং ভাব আছে!) এর চ্যাপ্টারে। সেই পুরান কাসুন্দি, অভিযোগ, বোর্হেস লাতিন আম্রিকার লেখক না; কিন্তু আসলে তো তিনি তা-ই! আস্তুরিয়াস যেইবার নোবেল পাইলেন, সেইসময় বোর্হেস কইছিলেন যে, নোবেলটা নেরুদারে দেওয়া যাইতে পারতো। আর এইটাতেই হয়তো আস্তুরিয়াস খেইপা গেছিলেন; বলছিলেন যে, বোর্হেস ইউরোপিয়ান লেখক! এই ‘বনাম’ এর কনকোশন রাজু আলাউদ্দিন টানছেন এইভাবে; “ নিজের সর্ম্পকে এই হানিকর মন্তব্য নিশ্চয় আস্তুরিয়াস জেনে থাকবেন। সুতরাং বোর্হেস সর্ম্পকে সাহিত্যিক কারণে যেমন, তেমনই এই হানিকর মন্তব্যের কারণেও ক্ষুন্ন হয়ে থাকতে পারেন আস্তুরিয়াস। ক্ষুন্ন বলছি এই কারণে যে, লাতিন আমেরিকার কোনো লেখকই তাঁকে ইউরোপীয় ঘরানার লেখক বলে করেন না। বরং ফুয়েন্তেসের ভাষায় তিনি হচ্ছেন খাঁটি লাতিন আমেরিকার লেখক।” এইখানে ‘লাতিন আমেরিকার কোনো লেখকই’ ব্যাপারটা খেয়াল করার মতো। আস্তুরিয়াস কি তাইলে ‘লাতিন আম্রিকার’ বাইরের লোক; আমার ধারণা, খুঁজলে এইরকম বাইরের লোক আরো ডজনখানেক বাইর করা যাইবো, যাঁরা একইরকমের সমালোচনা করছেন।  সেইটা ব্যাপার না, ব্যাপার হইতেছে যে, বোর্হেস এর বিরুদ্ধ-মত থাকতেই পারে; কিন্তু সেইটারে ধামা-চাপা দেয়ার চেষ্টাটা  বাজে একটা কাজ। আর ফুয়েন্তেস যে লতায়-পাতায় বোর্হেসরে লাতিন-আম্রিকান বানাইছেন, সেইটা ফুয়েন্তেস বইলাই পারছেন।

এই বিষয়ে আরেকটা উদাহারণ মনে পড়ছে। ফুকো একবার কইছিলেন যে, আগামী শতাব্দী হইবে দেল্যুজিয়ান শতাব্দী। এইটা শুইনা দেল্যুজ কইছিলেন যে, ফুকো কি কারণে এই কথা বলছেন, সেইটা তিনি ভালোভাবে বুঝছেন আর ফুকোও সেইটা ভালো কইরাই জানেন। ফুয়েন্তেস কি কারণে বোর্হেসরে লাতিন আম্রিকান বানাইছেন, সেইটা আমার ধারণা, বোর্হেসও ভালো কইরা বুঝছেন। কিন্তু সমস্যা হইলো রাজু আলাউদ্দিন এই সার্টিফিকেট শো কইরা বেড়াইতেছেন!

আর এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি বিডি-আর্টসে সুমন রহমানের কমেন্টও (http://arts.bdnews24.com/?p=3010) মনে করা যাইতে পারে যেইখানে উনি বলছেন যে,  লাতিন আম্রিকা কিন্তু পশ্চিম-ই; সাহিত্যের ভূগোলে। সুমন রহমানের এই কথা যদি মানি, তাইলে একটাই তো ঘরানা, এই বির্তকের ভিত্তি কই? এই ধারণাটারে আসলে আরো এক্সটেন্ট করা সম্ভব, কিন্তু সেইটা ভিন্ন আলোচনা। তখন এই বির্তক আবার নতুন পাটাতনে দাঁড়ায়। সেইটাও কথা না; কথা হইতেছে, ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু যিনি ইন্টারপ্রেট করতেছেন, তিনি ফ্যাক্টের মধ্যেও থাকতেছেন না, বোর্হেসের পূজারী হয়া তার দুর্বলতাগুলিরে হাইড করার চেষ্টা করতেছেন।

দ্বিতীয় আরেকটা জায়গার কথা বলি; নেরুদা বনাম বোর্হেস (বোর্হেস সর্ম্পকে ৩টা এন্ট্রি আছে, ৩টাতেই তিনি লাস্ট এন্ডে। কেন? যদি অ্যালফাবিটিক্যালিও ধরেন, এটলিস্ট ১টা বোর্হেস প্রথমে আসার কথা) এর কথা। নেরুদা আর বোর্হেস এর রাজনৈতিক জায়গাটা মিলার কথা না, এইটাই স্বাভাবিক। ‘বনাম’টা শুরু হয়, যখন বোর্হেস অভিযোগ করেন যে, নেরুদা লাতিন আম্রিকার স্বৈরশাসকদের নিয়া একটা বই লিখছেন, কিন্তু পেরন রে নিয়া কিছু বলেন নাই। নেরুদা এইটারে খন্ডন কইরা বলেন যে, তিনি পেরন এর এগেনেস্টও অনেককিছু করছেন। তখন রাজু আলাউদ্দিন কনক্লোশনটা টানছেন এইভাবে যে,  “নেরুদার এ ব্যাখ্যার যথার্থতা নিয়ে অবশ্য বির্তক রয়েছে অনেক। স্বৈরাচারী পেরোনের পক্ষে নেরুদার সাফাই গ্রহণযোগ্য মনে করেন নাই কেউই (শব্দটা খেয়াল করেন)। পশ্চিমের কিংবা লাতিন আমেরিকার কোনো (এই শব্দটাও দেখেন) গবেষক, লেখকই নেরুদার এই ব্যাখ্যাকে যথার্থ বলে মনে করেন না। সেই প্রসঙ্গে আমরা একটু পরে আলোচনায় যাবো। ” রাজু আলাউদ্দিন আর আলোচনায় যান নাই বা হয়তো যাইতে চাইছিলেন, সম্পাদকের কাঁচির নিচে চইলা গেছে, এই বেনিফিট অফ ডাউট টাও আমি উনারে দিতে চাই। কিন্তু ‘কেউই’ আর ‘কোনো’ এই শব্দ দুইটা খেয়াল করেন। নেরুদা তো ঝড়ের তোপে উইড়া গেলেন! এইটা কেমনে হইলো যে, বোর্হেস-ভক্ত রাজু আলাউদ্দিন এর মতো, একটা নেরুদা-ভক্ত পাওয়া গেলো না (তাও গোটা পশ্চিম এবং লাতিন আম্রিকা এক কইরা) যে তারে উদ্ধার করবে; এটলিস্ট স্কোরবোর্ডটা বোর্হেস:নেরুদা  – ১৪:০  না হইলেও ১৪:১ হইলেও দেখাইবে!

আমি বেকুব পাঠক, চাইয়া চাইয়া দেখলাম যে, সবগুলা ফাইটেই বোর্হেস জিইতা যাইতেছেন। আর জিতা তো জিতা, বোর্হেস একদম নক-আউট কইরা দিতেছেন প্রতিপক্ষরে। আমার ধারণা, এই অপ্রত্যাশিত বিজয়ে, বোর্হেসও বোকা হয়া যাইতেছেন। তাই এই লেথাটার শিরোনাম আমি দিছি, বোকা বোর্হেস।

এই একতরফা ফাইট দেখতে আমার খুব একটা ভালো লাগে নাই।  আমি নিজে যদিও খুব একটা ভদ্রলোক না, তারপরও বোর্হেস এর কথাই মনে হইছে এইটা লিখতে গিয়া, ভদ্রলোকেরা সবসময় পরাজিতের পক্ষে থাকেন।

বাংলা-ভাষায়, এই যে বিশেষজ্ঞ পাওয়া যাইতেছে, এইটা একটা পজিটিভ ঘটনা মনে হয় আমার কাছে। যেমন ধরেন, লাঁকা বিষয়ে কোনকিছু জানতে চাইলে আমরা সলিমুল্লাহ খানের কাছে যাইতে পারি, একইভাবে বোর্হেস সর্ম্পকে রাজু আলাউদ্দিনের জানা-শোনাও ব্যাপক। এক ধরণের আগ্রহ এবং ভালোবাসা থিকাই হয়তো উনাদের এই জানাশোনাটা তৈরি হইছে; কিন্তু এই জানাশোনাটা যদি উনাদের নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশন এর উপর না দাঁড়াইয়া, এক ধরণের অন্ধভক্তির জায়গায় দাঁড়াইয়া থাকে; তাইলে এইসব বিষয়ে, সেই অন্ধভক্তির কাছে আমরা আমাদের দৃষ্টি বন্ধক রাখি কেমনে?

 

আরো পড়তে পারেন

নরকের জল্লাদ
রামপুরা রোডে জ্যাম লাগে, রাত দশটার দিকে। মেজাজ তখন খিঁচড়া যায়। উল্টা-পাল্টা রিকশা চলে। ব...
অ্যা জার্নি বাই বাস
নারীর প্রতি নন-ভায়োলেন্স এবং একটা অ-পরিচয়ের ঘটনা গত রোজার ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময়ের ঘট...
বিকাল আসতেছে ধীরে
  বিকাল আসছে ধীরে, মেঘনার পাড়ে। বৃষ্টি আইসা ছুঁইলো তারে। বেড়ার হোটেলে, চায়ের ক...
প্রমথ চৌধুরী’র ‘মুখের ভাষা’
বাংলাভাষা লেখার এখনকার যে তরিকা সেইটা মোস্টলি প্রমথ চৌধুরী’র (১৮৬৮ – ১৯৪৬) আর্গুমেন্টগুলির...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *