গরিব কি জিনিস?

মানে, গরিব বইলা একটা জিনিস তো আছে দুনিয়াতে, যারা দিনে একবারও খাইতে পায় না, বা যাদের দিনে ১০০ টাকাও (বা এইরকমের একটা নাম্বার) ইনকাম নাই, তাদেরকে গরিব বলাটা জায়েজ আছে দুনিয়াতে।

এই সংজ্ঞাটা মোটামুটি ফিক্সড, কিন্তু লোকজন তো আর সংজ্ঞার ভিতরে থাকে না। কেউ আগে থিকা গরিব আছে, কেউ নতুন কইরা গরিব হয়, আবার কেউ মাঝে মধ্যে গরিব থাকে। যার ফলে, গরিব ঠিকঠাক মতো আইডেন্টিফাই করাটা একটু মুশকিলই হওয়ার কথা, আমাদের এই দুনিয়ায়।

ধরেন, এমনিতেই আমাদের ধারণাতে তো আছে, রিকশা চালায় – মানে, গরিব; অফিসে চাকরি করে – (পিয়ন, মেসেঞ্জার, যা-ই হোক) – গরিব না।* মানে, প্রফেশনের একটা কন্ট্রিবিউশন আছে, গরিবের পারসেপশনে; পুরাটাই ইকোনমিক্যাল ঘটনা না।…

এই ‘গরিব অর্থনীতি’ তো দিনে দিনে আরো ক্রুশিয়াল সাবজেক্ট হয়া উঠতেছে অ্যাকাডেমিক স্টাডিজে। তো, সেইখানে বলার মতো তিনটা কথা মনে হইলো। (আর্গুমেন্টের জায়গাটা একই।)

একটা হইলো, কারা গরিব? – এই প্রশ্নের চাইতে কারা কেমনে ‘গরিব’ হওয়ার লাইনে আছেন, সেইটা ধরতে পারা’টা জরুরি। এইখানে ‘অ্যাকশন’টা শুরুই হইতেছে ‘গরিব’ হওয়ার পরে; যে, গরিব’রে আপনে কেমনে হেল্প করবেন, গরিবি থিকা কেমনে বাঁচাইবেন, এই সেই।… কিন্তু ‘গরিব’ হওয়া কিন্তু কমানো যাইতেছে না!

তো, গরিব কেমনে গরিব হইতেছে – সেই জায়গাটাতে নজর দেয়াটা বেশি দরকারি। মানে, গরিব’রে তো গরিবি থিকা ‘মুক্তি’ দিয়া কনজিউমার বানাইতেছেই এঞ্জিও’রা, কিন্তু ‘নতুন গরিব’ হওয়া কি কোনভাবে ঠেকানো যাইতেছে কিনা – সেইটার কথা ভাবাটা দরকারি জিনিস একটা। মানে, গরিব’রা তো মরতেছেই 🙂 যদি ‘নতুন গরিব’ আর না বানাইতে পারেন, ৫০ বছরে এমনিতেই ‘গরিব’ নাই হয়া যাওয়ার কথা দুনিয়ায়। (এতো সহজ হয়তো না, কিন্তু একটা বড় কন্ট্রিবিউশন থাকার কথা।)

আর, যারা অলরেডি গরিব, তাদের কি হবে? আমার ধারণা, যেইভাবে গরিব’রে একটা মোবাইল ফোনের মতো ভাবা হয়, যে যারে চালু রাখতে হইলে বা বাঁচায়া রাখতে হইলে চার্জ দেয়ার মতো কইরা একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করা দরকার – এইটা যে সাফিশিয়েন্ট না, এইটাও তো আমরা জানি; কিন্তু এর বাইরে তেমন কিছু ভাবতে পারি বইলাও মনেহয় না।

আগে তো পেটে খাবার পড়ুক, বাঁচুক – এইভাবে আমাদের ‘ভাবতে না পারা’টার ভিতরে ‘গরিব’রে আটকায়া ফেলতে পারি আমরা। সেইখান থিকা, গরিব’রে একটা কনজিউমারের স্ট্যাটাসে আপগ্রেড না কইরা, তার ‘গরিবি’ থিকা তারে ‘মুক্তি’ না দিয়া বরং যেই অ্যাক্ট বা প্রফেশনগুলা তারে গরিব বানায়া রাখে, সেই জায়গাগুলারে রি-ডিফাইন করার কথাই ভাবতে পারাটা দরকার।

ঠিকঠাক উদাহারণ দেয়াটা মুশকিলেরই হবে, কিন্তু যেই প্রফেশন ‘গরিব’ বানায়া রাখে, সেই জায়গাটা নিয়াই ভাবতে পারতে হবে। এখন, যেমন মিনিমাম ওয়েজের কথা কই আমরা, এইরকমের কিছু, কিন্তু মিনিমাম ওয়েজ না আর কি! এইটা টোটাল সিস্টেমেরই একটা পার্ট হওয়ার কথা তখন।

শেষ কথা হইলো, গরিবি’রে একটা জেলখানা হিসাবে দেখেন। যেইখানে, যে গরিব, তার একসেস নাই সার্টেন জিনিসে, তার হক সে পাইতেছে না। এই হক’গুলারে ফিক্সড করেন, আর সোসাইটিতে সবাই যাতে এই হক’গুলা পাইতে পারে – সেই সিস্টেমটারে বানানোর কথা ভাবেন। মানে, এখন যেইভাবে গরিবি দূর করা হইতেছে, সেইটা হইতেছে, নৌকার তলার ছিদ্র দিয়া ভুর ভুর কইরা পানি উঠতেছে, আর আপনি ছোট্ট পাতিল দিয়া পানি ফেলতেছেন; এখন বড় বালতি দিয়া পানি ফালানো শুরু করলেও জিনিসটা এফেক্টিভ হবে না, যদি না আপনি ফুটা বন্ধ না করেন।

ব্যাপারটা এইরকম না যে, গরিব’রে ‘হেল্প’ করবেন না, কিন্তু হেল্প করার চাইতে তারে তার হক’গুলা বরং দেন! এই যে আপনি ‘হেল্প’ করতেছেন, এইটা গরিব’রে গরিব বানানির আরেকটা তরিকাই হয়তো, শেষমেশ।

…………………………

*একটা উদাহারণের কথা মনে পড়তেছে এখন, সিএনজিঅলারা যে একসময় ঢাকা শহরে প্যাসেঞ্জারের লগে ‘ঝামেলা’ করতো, তখন আমি হিসাব কইরা দেখছিলাম উনাদের যেই ইনকাম, সেইটা সিএনজি’তে যেইসব মিডলক্লাশরা চড়েন, তাদের চে কম ছিলো না, যার ফলে প্যাসেঞ্জারের চোটপাট নিতে রাজি না হওয়ার একটা ব্যাপারও থাকার কথা। আবার, পাঠাও বা উবার মটো’তে মোটরসাইকেলঅলাদের সাথে প্যাসেঞ্জারের ঝামেলা যে কম হয়, সেইখানে মোটরসাইকেল চালানোর ‘হিরোজম’রও একটা কন্ট্রিবিউশন নাই – তা-ও না কিন্তু!

Leave a Reply