ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শান্তিতে নোবেল প্রাপ্তির ঘটনা

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শান্তিতে নোবেল প্রাপ্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা, বিশেষ করে ‘আমাদের’ জন্যে, যারা বাংলাদেশের জনগন, যারা দরিদ্র না হৈয়াও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্ন্তভুক্ত, তাদের প্রতিনিধিত্ব করি, তাদের জন্য; এমনকি অন্য অনেকের জন্যেই। আমার ধারণা প্রায় সবাই সেইটা অনুধাবন করতে পারতেছেন, এইটা নিয়া সংশয়ের কিছু নাই। এই ঘটনা অনেককিছুকে সিগনিফাই করে, অনেকগুলি বিষয়কে স্পষ্ট করে বলে। এই ঘটনাকে ইগনোর করার, ছোট করার কিছু নাই। এর তাৎপর্য বহুবিধ।

সবচেয়ে প্রথমে মনে হৈছে যে, কিছুদিন আগে যেমনটা কথা হচ্ছিল যে, ‘আমরা’ কী করি না করি বা কী ভাবি না ভাবি তা দিয়া ‘পশ্চিমাদের’ কিছু যায় আসে না; কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, এইটা সত্যি না। এইখানে চলমান ঘটনাসমুহে ‘পশ্চিমাদের’ আগ্রহ আছে, এক ধরণের সম্পৃত্ততা তারা অনুভব করেন বা চান; অর্থাৎ ‘আমরা’ আর বিচ্ছিন্ন কোন অস্তিত্ব না, পুঁজির সামগ্রিক চিন্তার অংশীদার ।

দ্বিতীয়ত, ড.মুহাম্মদ ইউনূসের ইনোভেশন বা আবিষ্কার বা কাজ-কাম হৈতেছে ইকোনোমিকসের, কিন্তু তিনি নোবেল পাইলেন শান্তিতে, কিভাবে তার আবিষ্কার বা কর্ম-প্রক্রিয়া শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে, সেইটার বিবেচনাটা-ই এইখানে জরুরী। একটা বিষয় খেয়াল করবেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তিতে সকল কর্পোরেটই একযোগে খুশি, আনন্দে বিহ্বল প্রায়; তার কারণ হিসাবে আমার মনে হৈছে যে, তার আবিষ্কার পুঁজির সীমানাকে বাড়িয়ে দেয় আর এইভাবে পুঁজিকে সিকিউর রাখার চেষ্টাও করে। গরীবকে বোঝায় যে, পূঁজিতে তোমারও একসেস আছে, তুমিও তা পাইতে পারো। সুদের হার বা বিভিন্ন পরিসংখ্যান আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় নাই, এই যে গরীর মানুষকে পুঁজির সীমানার মধ্যে নিয়া আসতে পারা সেইটা একটা বিশাল ব্যাপার, পুঁজির পক্ষে তা অনেক সম্ভাবনা ও শান্তি নিয়া আসার সম্ভাবনা রাখে। পুঁজিকে তা ভালো একটা মোড়ক উপহার দেয়। আর কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সেবেলিটি তো ক্রমশঃ জরুরী একটা ব্যাপার।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস

ড. মুহাম্মদ ইউনূস

 

তৃতীয়ত, এইটা মধ্যবিত্তদেরকেও একটা সুযোগ দেয়; পুঁজি ও পুঁজিহীনতার মাঝামাঝি বসে থেকে, বখরার একটা স্বাদ পাবার, যার ফলে পুঁজির বিপক্ষে কু-চিন্তার কোন অবকাশ বা সময় থাকে না। অর্থাৎ, এই ধরণের কার্যক্রম গরিব দেশগুলিতে পুঁজির বিরুদ্ধে যে কোন ধরণের অপতৎপরতা বা চিন্তা-ক্ষমতাকে অনেকদূর পর্যন্ত ব্যাহত করার ক্ষমতা রাখতে পারে। উদাহারণ হিসাবে, অনেকে হয়তো পুরানো বিপ্লবীদের এনজিও চর্চা নিয়া বলতে পারবেন।

এর পরেও আরো কথা থাকে, বাংলা একাডেমী পুরস্কার ও নোবেল পুরস্কারের দূরত্বটাও হয়তো অনেকে অুনধাবন করতে পারবেন। কতোটা পথ হাঁটলে একজন মানুষ ‘বাংলা একাডেমী’ পাইবেন, আর কতোটা পথ হাঁটলে একজন মানুষ ‘নোবেল একাডেমী’ পাইবেন, তার সীমানা অনির্ধারিত না। তার মানে, ‘বাংলা একাডেমী’ বা ‘নোবেল’ যে কোন ভালো লোক পায় নাই, তা কিন্তু না; তার মধ্যে যে একটা রাজনীতি যে নাই, তাও এইজন্য ঠিক না; অনেকের অনুধাবনের মধ্যেই তা আছে। তাই ‘নোবেল পুরস্কার’ এর রাজনীতিকে অস্বীকার করার কোন উপায় নাই। তার মানে আবার এইটা না যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কৃতিত্বকে খাটো করা, বরং তার অবস্থান এবং উদ্দেশ্যকে বোঝার জন্যই এইটা জরুরী। এই নোবেল পাওয়া একটা বিশাল অ্যাচিভমেন্ট, এই অর্থে যে, ‘গরিবরা’ও ‘শান্তি’র জন্য জরুরী, এই বিষয় এর সমর্থন এতে থাকে, দে আর নট এক্সক্লুডেড! উই আর এলসো ইনক্লুড নাও!! ‘বিশ্বশান্তি’ কি বিশাল একটা ব্যাপার, আর তার মধ্যে আমরা, এই গরিব মানুষরা, গরিব না হৈয়াও, গরিব জনগোষ্ঠীর ভিতর যে আটকাইয়া ছিলাম, ব্রেথ নেয়ার একটা জায়গা পাইলাম।

ইউনূস শুধুমাত্র চিন্তা করেন নাই, তিনি কাজটা করছেন এবং হয়তো তার উদ্দেশ্যের দিক থিকা সফল বা অসফল হৈছেন, কিন্তু তিনি যে শুধুমাত্র তার চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন না বরং অংশগ্রহণ করেন, এইটা আমাদের দেশের চিন্তাচর্চাকারীদের জন্য একটা বড় লারনিংস।

ইউনূসের স্বপ্নটাকে যদি একটু সরল করে দেখেন, তাহলে দেখবো যে, তিনি চান কেউ গরিব না থাকুক, পুঁজি একসেস এর ক্ষমতা সবার থাকবে, গরিব মানুষ লোন নিবে, কাজ-কাম করবে, জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন হবে, অর্থাৎ মানুষ বেশি করে লাক্স সাবান ব্যবহার করবে, গ্রামীন ফোনে কথা বলবে, অর্থাৎ বাজার সৃষ্টি হবে; আর পুঁজি তো মুখিয়ে আছে এই পোটেনশিয়াল মার্কেট কবে উন্মোচিত হবে। এই স্বপ্নে পুঁজির জন্য সম্ভাবনা আছে, তার অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের মানুষেরও যে নাই, তা কে বলবে?

আমার এই বিবেচনা হয়তো ঘটনার সামগ্রিকতাকে ধারণ করে না, শুধুমাত্র পুঁজির দিক থিকা এই বিবেচনা; কেউ যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বিবেচনা রাখতে চান, আমার ধারণা, আরো নতুন সংযোজন সম্ভব। যেমন ধরেন, বাংলাদেশে তো পুঁজির সেইরকম বিকাশ ঘটে নাই, তো এইরকম একটা অর্থনীতিতে পুঁজি কিভাবে সংগঠিত হবে বা হচ্ছে; আবার আর্ন্তজাতিক পুঁজি’র সাথে বাংলাদেশের সংযোগটা কিভাবে ঘটবে, ভারতীয় পুঁজি আমাদেরকে গ্রাস করবে নাকি ইউরোপীয় পুঁজির প্রতিনিধিত্ব করবো, এই প্রোপজিশনগুলি এখনো ব্যাখার অপেক্ষায় আছে। আমি চেষ্টা করেছি একটা বিবেচনা রাখতে, যাতে এই প্রক্রিয়ায় যে আরো সংযোজন সম্ভব, তা ঘটতে পারে।

সবশেষে (কিন্তু সবার শেষে নয়) এই ঘটনা নিয়া যারা চিন্তা করতেছেন, তাদেরকে বলতে পারি যে, আসুন পুঁজির বিজয় নিয়া আমরা আর উৎকন্ঠিত না হই, বরং দেখি যে, তার ভয়ের সীমানা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং চিন্তা করি যে, যখন পুঁজি তার জন্য একটা অপশন বাড়ায়, সম্ভাবনাও একটা করে শেষ হয়ে যায়, আর এর সাথে আরো অনেকগুলি সংকটও অবধারিতভাবে তেড়ে আসে তার দিকে।

 

ইমরুল হাসান,
ঢাকা, ১৯/১০/০৬.

 

Leave a Reply