আহমদ ছফা’র ইতিহাস বর্ণনা

আহমদ ছফা ১৯৬৭ সালে বিএ পাশ করার পরে দুই বছর সময় নিয়া ইতিহাসের একটা বই লিখছিলেন “সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস” নামে, যেইটা ১৯৭৯ সালে পয়লাবার ছাপা হয়। পরে ১৯৮৭ সালে বইটার সেকেন্ড এডিশন এবং ১৯৯৬ সালে প্রতিপক্ষ প্রকাশনা থিকা বইটার থার্ড এডিশন ছাপা হয়। তো, এই বইটার নাম খুব একটা শোনা যায় না, কারণ বই হিসাবে এইটার তেমন কোন সিগনিফেন্স নাই; মানে, বইটাতে আহমদ ছফা’র নিজের তেমন কোন বিচার-বিবেচনা নাই; যেইসব রেফারেন্স বই উনি ইউজ করছেন, সেইগুলার ন্যারেটিভটারেই উনি নিছেন। 
ফার্স্ট এডিশনের ফার্স্ট লাইনেই উনি বলছিলেন, “আমার যৌবন ধর্মের অপরাধের প্রমাণ এই গ্রন্থ।” তো, উনার এই লাইনরে ভুলভাবে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি, যেন উনি বইটারে বাতিল কইরা দিতে চাইতেছেন। কিন্তু আসলে, তা না; বরং দুইটা কারণে এই বইটা নিয়া উনি রিস্ক ফিল করতেছিলেন। পয়লা কারণ’টা বেশ ইন্টারেস্টিং, “এ রকম জমকালো বিষয়ে গম্ভীর একখানি কেতাবের লেখক জানলে লোকে আমার লেখা গল্প, উপন্যাস, কবিতা অন্যান্য রচনা পড়বে না। আমাদের দেশের পন্ডিতদের লেখার প্রতি সাধারণ মার্জিত রুচির পাঠকদের একটা ভীতি এবং একটা অনীহার কথা আমি জানতাম।” সাউন্ডস ফিমিলিয়ার? 🙂
মানে, আপনি ‘পন্ডিত’ বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ হইলে ‘কবি-সাহিত্যিক’ হইতে পারবেন না। দুইটা দুই জিনিস। 🙂 এই ডরে উনি বইটা ছাপাইতে চাইতেছিলেন না। তো, দেখেন, এইটা কিন্তু আছেই; আহমদ ছফা যতোটা ইন্টেলেকচুয়াল হইতে পারছেন, ‘কবি-সাহিত্যিক’ কিন্তু হইতে পারেন নাই এতোটা! এই বইয়ের কারণে না, বরং আমরা আইডেন্টিটি হিসাবে “দুইটা দুই রকম” ভাবতে পারতেছি বইলাই। এই পারসেপশনের জায়গাটাতে আহমদ ছফা নিজেও সাবস্ক্রাইবই করতেন।… (বইলা রাখা ভালো, দুইটা একইরকম – এইটা আমার প্রপোজিশন না, বরং পারসেপশনগুলা কেমনে কাজ করে, সেইটার কথাই বলা।)
দুসরা জিনিস হইলো, থার্ড এডিশনের ভূমিকাতে, ১৯৯৬ সালে উনি বলতেছেন, এখন যদি বইটা লিখতেন তাইলে এইরকম ঘটনা-ওয়াইজ না লেইখা পারসন-ওয়াইজ লিখতেন। মানে, আরো টেরিবল ব্যাপার হইতো একটা! 🙁 উনি ইতিহাসরে দেখতেছেন ব্যক্তি’র ভুল আর সাহসের জায়গা থিকা, “সিপাহী যুদ্ধের আনুপূর্বিক ঘটনা বর্ণনা করার বদলে সিপাহী যুদ্ধের কতিপয় কুশীলবকে নিয়ে একটি ভিন্ন রকমের গ্রন্থ রচনা করতে চেষ্টা করতাম।…আজিমুল্লা, তাঁতিয়া টোপী, ঝাঁসির লক্ষীবাঈ, মাওলানা আহমদউল্লাহ… সামন্তবাদের জগদ্দল ঠেলে এ অসাধারণ মানুষ মানুষীরা যদি যথার্থ ভূমিকায় অভিনয় করতে পারতেন তাহলে এই যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখিত হতো।” হয়তো সেইটা একটা ডকু-ফিকশন হইতো তখন। উনার ‘সাহিত্য করার’ জায়গা থিকা সেইটা ভালোও হইতো হয়তো। কিন্তু ইতিহাস হিসাবে আরো ট্রাশ একটা ব্যাপারই হওয়ার কথা; কারণ ব্যক্তির যে কোন ভূমিকা নাই – তা না, ইতিহাসের ঘটনাগুলা ব্যক্তির অ্যাক্ট দিয়া, চিন্তা দিয়া ইনফ্লুয়েন্সড হইছে বইলাই ব্যক্তির জীবনীই তো ইতিহাস না! বরং ইতিহাসরে কোন ধারণা’র জায়গা থিকা আমরা দেখতেছি, সেইটা জরুরি একটা জিনিস। আহমদ ছফা’র কাছে এই এক্সপেক্টশন করাটাও আসলে ঠিক না। কিন্তু উনার টেনডেন্সিটারে মার্ক কইরা রাখাটা দরকার, যাতে উনার ভুলগুলারে ‘সাহস’ বইলা রিপিট না করতে থাকি আমরা।

তো, “সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস” বইটা যে আহমদ ছফার বই হইতে পারে নাই, তার মেইন কারণ এইটাই যে, উনার নিজের কোন রিডিং-ই নাই! বারবার এই কথাই উনি বলছেন যে, ইংরেজদের অনেক ভালো কাজ দেশি, অশিক্ষিত লোকজন বুঝতে পারে নাই! সেক্যুলার যে ভালো জিনিস ধর্মের চাইতে সেইটা ধর্মীয় কুসংস্কারচ্ছন্ন ইন্ডিয়ানরা ধরতে পারে নাই।… আহমদ ছফা’র মতো একজন ‘বাঙালি মুসলমান’ 🙂 এইসব কথা বলতেছেন দেখলে অনেকেরই শরম পাওয়ারও কথা এখন।
কিন্তু আমার ধারণা, বই লেখার উদ্দেশ্য’টা নিয়াই ঝামেলা ছিল। এই দেশে সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস নিয়া কোন বই লেখা হয় নাই – এইটা ছিল প্রাইমারি উদ্দেশ্য, বইটা লেখার; যার ফলে কি কি ঘটনা ঘটছিল – সেইসব বর্ণনার দিকে উনার নজরটা বেশি ছিল, অনেক বেশি ইনফরমেশন ইনসার্ট করতে চাইতেছিলেন। পুরা কাহিনিটা বলতে চাইতেছিলেন। তো, ইনফরমেশন হিসাবে যা ছিল, তার সবই হইতেছে ইংরেজ এবং শিক্ষিত ইন্ডিয়ানদের; সেই ইনফরমেশনগুলারে উনি ‘সত্যি’ হিসাবে বইলা গেছেন! (মানে, এর চাইতে বড় ভুল তো আর কিছু হইতে পারে না।) সিপাহীদের প্রতি একটা সিম্পেথাইজড মন নিয়া যে, ইশ! এই ভুলটা যদি না করতো, অই ভুল বুঝাবুঝিটা যদি না হইতো! যার ফলে, বইটা এক ধরণের টেক্সট বইয়ের বাইরে এক রকমের ‘নোটবই’ টাইপের ব্যাপারই হইছে।
যদিও এই সাবজেক্টের উপ্রে ‘নোটবই’ কম-ই আছে বাংলাদেশে। কিন্তু আমার সাজেশন হইলো, সাবজেক্টের জায়গা থিকা না দেইখা, ন্যারেটিভের জায়গাটা থিকা দেখতে পারলে ভালো; যে, ইতিহাসের ঘটনাগুলাই ইতিহাস না, বরং ঘটনাগুলারে কোন জায়গা থিকা দেখতেছি আমরা সেইটাই ‘ইতিহাস’ হয়া উঠার ঘটনা।…

Leave a Reply